এক্সক্লুসিভ ফরিদপুর সদর

‘অনাহারী ভবঘুরে মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই যার নেশা’

কামরুজ্জামান সোহেল #
আলিম আল রাজী আজাদ। ফরিদপুরের সবাই তাকে একনামে ডাকেন ভবঘুরে অনাহারী মানুষের ‘খাদ্য দাতা’ হিসাবে। সকাল হতেই নিজের মোটর সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন বাড়ী থেকে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। খুঁেজ বেড়ান ছিন্নমূল অসহায় মানুষকে। কখনো ছুটে যান রেলষ্টেশন, বাস স্ট্যান্ড, ট্রাক স্ট্যান্ড, কোট চত্বর, জনবিক্রির হাট কিংবা বস্তিতে। ছুটে যান ফুটপাতে থাকা পাগল ও ছিন্নমূল নারী, পুরুষ ও শিশুদের মাঝে। সকাল থেকে বিকেল অব্দি খুঁজে খুঁজে বের করেন পাগল, অনাহারী ছিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষকে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রান্না করা খাবার। হতদরিদ্র মানুষেরা বসে থাকেন কখন তাদের প্রিয় মানুষটি তাদের কাছে খাবার নিয়ে আসবেন। এভাবেই চলছে প্রতিদিন। অনাহারী মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়াটাই যেন তার নেশায় পরিনত হয়েছে। প্রতিদিন কয়েকশ মানুষকে তিনি ঘুরে ঘুরে বিতরন করছেন রান্না করা খিচুরী কিংবা পোলাও। গত ১০ মে সোমবার পর্যন্ত তিনি তার এ কার্যক্রমের তিনশত চার দিন অতিবাহিত করেছেন। প্রত্যেক দিন শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে তিনি এসব খাদ্য বিতরন করছেন।
ফরিদপুর শহরের কমলাপুর এলাকায় বাড়ী আলীম আল রাজী আজাদের। বাবা-মায়ের বড় সন্তান সে। বাবা-মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলে অনেক বড় নামকরা ইঞ্জিনিয়ার হবেন। সেই ভাবেই চলছিল তার পড়ালেখা। ২০০১ সালে মাষ্টার্স শেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগ দেন। কিন্তু সেই চাকুরী তার কাছে ভালো লাগেনি। স্বাধীন ভাবে কাজ করার মানসে ৭ বছর পর সে চাকুরী ছেড়ে দেন। মানুষের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ নিয়েই আলিম আল রাজী আজাদ নেমে পড়েন মানবতার সেবায়। প্রথম দিকে বিভিন্ন বাসা-বাড়ির বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করে বিলিয়ে দিতে থাকেন অসহায় দরিদ্রদের মাঝে। পরবর্তীতে তার বন্ধুদের সহায়তা নিয়ে এবং নিজের উপার্জন থেকে কিছু টাকা দিয়ে এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন তার কার্যক্রম। শুধুমাত্র ছিন্নমূল হতদরিদ্র পাগলদের খাবার দেওয়ার মধ্যেই তার কাজের সীমাবদ্ধতা নেই। সব সময় মানুষের কল্যানে কাজ করে যাওয়া এ যুবকটি যখনই শুনতে পান কেউ বিপদে পড়েছে ছুটে যান সেখানেই। কারো রক্ত লাগবে, কারো পড়ালেখার খরচ নেই, কেউবা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না টাকার অভাবে। আলিম আল রাজী আজাদ যেন তাদেরই একমাত্র সম্বল। কারো ঘর নেই, নেই উপাজর্ন করার কোন কিছু, টাকার অভাবে কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না, কোন মসজিদ-মাদ্রাসায় আসবাবপত্র নেই সেখানেও হাজির আলিম আল রাজী আজাদ। দুঃস্থ্য ও বিধবা মহিলাদের সেলাই মেশিন প্রদান, হতদরিদ্রদের ঘর তুলে দেওয়া, দরিদ্র মানুষকে কর্মসংস্থানের জন্য ভ্যান কিনে দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মানবতার ফেরিওয়ালা উপাধি পাওয়া এই যুবকটি গত বছর করোনার পর থেকে কয়েকশ মানুষকে চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী বিতরন করেছেন। সেই খাদ্য বিতর কার্যক্রম এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ঈদ-পূজোয় হতদরিদ্র ছিন্নমূল নারী, শিশুদের মাঝে বস্ত্র বিতরনও করছেন তিনি। ছিন্নমূল ভবঘুরে মানুষের মাঝে প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরনের পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন রোজাদারদের মাঝে ইফতারী বিতরন। সাহিত্যপ্রেমী এ মানুষটি মাসের পর মাস ফরিদপুরের ফুটপাতে পড়ে থাকা অভুক্তের মুখে নিয়মিত এক বেলা খাবার তুলে দিয়ে ফরিদপুরবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। অসহায় মানুষের পাশে থাকার জন্য যখনই কিছুর দরকার পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে আকুতি জানিয়ে স্ট্যাটার্স দেন। অনেকেই তার স্ট্যাটার্সে সারা দিয়ে আর্থিক সহযোগীতা করেন কেউবা খাবার দিয়ে সহযোগীতা করেন।
আলীম আল রাজী আজাদ বলেন, আমি মানবিক কাজে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন সময় ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মানবতার ভাইবোন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সেই সহযোগিতায় আমি দরিদ্র মানুষের মাঝে পৌছে দেই। আজাদ বলেন, মহান আল্লাহ আমাকে যতদিন সুস্থ্য রাখবে ততদিন আমি মানুষের জন্য আমার এই ছুটে চলা অব্যাহত রাখবো। আমার জীবন হতদরিদ্র মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। প্রতিদিন এভাবে দরিদ্র মানুষ খুজেঁ বের করে তাদের সহয়তা করে চলছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *