৫ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Home » এক্সক্লুসিভ » হত্যার মিশন নিয়েই কাইচাইল আসে যুবলীগ নেতা হৃদয়-হাসান

হত্যার মিশন নিয়েই কাইচাইল আসে যুবলীগ নেতা হৃদয়-হাসান

কামরুজ্জামান সোহেল #
আওয়ামী লীগের উঠোন বৈঠকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে হামলায় দুইজন নিহত ও ৮ জন আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাইচাইল ইউনিয়নজুড়ে শোকাবহ অবস্থা বিরাজ করছে। ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে ইউনিয়নবাসীর। নিহতের স্বজনদের আহাজারী চলছে। ঘাতকদের গুলিবর্ষনে নিহত হন কাইচাইল ইউনিয়নের বাবুর কাইচাইল গ্রামের বাসিন্দা, অগ্রণী ব্যাংক ফরিদপুর তিতুমীর বাজার শাখার ক্যাশিয়ার মোঃ রওশন মিয়া (৫২) ও একই এলাকার তুহিন মিয়া (২৪)। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ৮ জনের মধ্যে গোলাম রসুল ও গোলাম মাওলা নামের দুইজনের অবস্থা আশংকাজনক। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সর্টগানের ছড়ড়া গুলিতে তার গলা ও শরীর মারাত্বক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এরা। নৃশংস এ হামলায় খুনিদের ফাঁসির দাবীতে উত্তাল এখন নগরকান্দা। ঘটনার পর থেকে খুনিদের বিচার চেয়ে মিছিল, সমাবেশ হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে নগরকান্দা এম এন একাডেমীর সামনে ঘন্টা ব্যাপী এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য রাখেন নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুস সোবহান মিয়া, কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন ঠান্ডু, চরযশোরদী ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান পথিক, সংসদ উপনেতার পিও আজাদ হোসেন, নিহতের বোন আসমা শহীদ।
বক্তারা অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান। মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিন করে উপজেলা পরিষদের গিয়ে শেষ হয়।
গত ১০ আগষ্ট সন্ধ্যায় নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের উঠোন বৈঠকে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলাকারীদের গুলিতে আহত হয় ১০ জন। এদের মধ্যে দুইজন নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ বাকি ৮জন এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে দুইজনকে হত্যার পর আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দলের নেতারা একজোট হয়ে খুনিদের বিচার চেয়ে আন্দোলন করছেন। এদিকে, জোড়া খুনের ঘটনায় মূল হামলাকারী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হানিফ মিয়া হৃদয়সহ ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের কাছ থেকে একটি শর্টগান ও ৩৬ রাউন্ড গুলি এবং একটি জীপ গাড়ী উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত তুহিনের পিতা রায়হান মিয়া বাদী হয়ে নগরকান্দা থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় ২১ জনের নামউল্লেখ করে এবং ১০/১২ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে। মামলার আসামীরা হলেন-আউয়াল মোল্লা, হানিফ মিয়া ওরফে হৃদয়, এনামুল হাসান, রেজাউল মাতুব্বর, কাইয়ুম মিয়া, রবিন সিকদার, দুলাল মিয়া, আতিক মিয়া, হাবিব মিয়া, পাচু মিয়া, আবুল খায়ের, পারভেজ মিয়া, বোরহান মিয়া, রেজাউল মিয়া, মাসুদ মাতুব্বর, ইয়াকুব মিয়া, ইদ্রিস আলী ওরফে মিন্টু মিয়া, খায়ের উজজামান মিয়া, মেহেদী মোল্লা, বতু মিয়া ও আসাদ সিকদার।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে-
স্থানীয় এলাকাবাসী, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সরেজমিন কাইচাইল বাবুর গ্রামের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কাইচাইল ইউনিয়নের বাসিন্দা যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হানিফ মিয়া হৃদয় ও তার ভাই নগরকান্দা উপজেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক এনামুল হাসানের সাথে ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন ঠান্ডুর সাথে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সর্ম্পকে চেয়ারম্যান ঠান্ডু ও যুবলীগ নেতা হৃদয় চাচা-ভাতিজা। বিগত ২০১৭ সালে একটি হত্যা মামলার বিরোধ নিয়ে বিরোধের জের ধরে এলাকা ছাড়েন হানিফ মিয়া হৃদয়। ঢাকায় থেকে বিভিন্ন ব্যবসা-বানিজ্যের পাশাপাশি যুবলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয় হন। ২০১৭ সালে এলাকা ছাড়ার পর সে আর এলাকায় আসেনি। এবার ঈদে এলাকায় আসার আগাম ঘোষনা দেয় হৃদয়। এতে বিক্ষুব্দ হয়ে উঠে প্রতিপক্ষের লোকজন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন ঠান্ডুর সমর্থকেরা ১০ আগষ্ট বিকেলে কাইচাইল পূর্বপাড়া মাদ্রাসা মাঠে ঈদ ও শোকদিবস পালন উপলক্ষে উঠোন বৈঠকে বসেন। এসময় দুইটি গাড়ীতে করে যুবলীগ নেতা হৃদয় ঐ স্থান দিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে প্রতিপক্ষের লোকজন গ্রামে ঢুকতে বাঁধা প্রদান করে। এ নিয়ে দুইপক্ষের মাঝে কথা কাটাকাটি ও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে যুবলীগ নেতা তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও তার ভাই এনামুল হাসান সর্টগান দিয়ে এলোপাথারী গুলি চালায়। অতর্কিত এ আক্রমনে হতবিহব্বল হয়ে পড়ে উপস্থিত ৩০/৪০ জন মানুষ। সেখানে থাকা লোকজন দৌড়ে পালিয়ে গেলেও গুলিতে লুটিয়ে পড়ে ১৪ জন। এ সুযোগে হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ঘটনাস্থল থেকে বিনা বাঁধায় পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ ১৪ জনকে উদ্ধার করে প্রথমে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ৪ জনকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মারাত্বক ভাবে আহত ১০ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রওশন মিয়া ও তুহিন মিয়া মারা যায়। আহতদের মধ্যে গোলাম রসুলের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। বাকিদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কথা কাটাকাটির কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুলি শুরু করে হৃদয় ও এনামুল হাসান। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই নৃসংশ এ হামলা চালানো হয় নিরিহ মানুষদের উপর। তারা জানান, হৃদয় ও হাসানের সাথে এলাকার ১০/১২ জন থাকলেও ঢাকা থেকে হৃদয় তার দুটি গাড়ীতে করে ঢাকা থেকে আরো ১০ জনকে নিয়ে আসে। তারা বলেন, পরিকল্পিত ভাবেই হৃদয় ও হাসান এ হামলা চালিয়ে দুইজনকে হত্যা করে। কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন ঠান্ডুসহ তার ঘনিষ্ট কয়েকজনকে হত্যার মিশন নিয়ে এলাকায় আসে হৃদয় ও তার ভাই হাসান। হত্যার পর ঘাতকেরা দুইটি গাড়ীতে করে পালিয়ে যায়। পরে রাতে মাদারীপুরের শিবচর থানা পুলিশ ঘটনার মূল হোতা যুবলীগ নেতা হানিফ মিয়া হৃদয় ও তার ৪ সহযোগীকে আটক করে। পরবর্তীতে আরো দুইজনকে আটক করা হয়। ঘটনার পরবর্তীতে কাইচাইল বাবুর গ্রামসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন ঠান্ডু জানান, হত্যার মিশন নিয়েই এলাকায় আসে হৃদয় ও হাসান। নইলে সে কেন আমাদের উঠোন বৈঠকে এসেই নির্বিচারে গুলি চালায়। তিনি বলেন, এলাকার নিরিহ দুইজনকে তারা হত্যা করেছে এবং আরো ৮ জনকে গুলিবিদ্ধ করেছে। এই ঘটনার সাথে জড়িত বাকিদের দ্রুতই আটক করতে হবে। নইলে উত্তেজিত এলাকাবাসীকে শান্ত রাখা সম্ভব নয়।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান জানান, ঘটনার পর পরই পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেবার কারনেই ৬ জনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন...

নগরকান্দায় যুবলীগের হামলায় নিহত-২, আহত-৮

সোহাগ জামান # ফরিদপুরের নগরকান্দার কাইচাইল ইউনিয়নে পূর্ব শক্রুতার জের ধরে যুবলীগের হামলায় ২জন নিহত …

সালথায় পুলিশের জালে ৫ ইয়াবা ব্যাবসায়ী

আবু নাসের হুসাইন, সালথা # ফরিদপুরের সালথায় ৫জন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে আটক করেছে থানা পুলিশ। শুক্রবার …