৬ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার ২২ অগাস্ট ২০১৯
Home » বৃহত্তর ফরিদপুর » রাজবাড়ী » রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে শুধু নেই আর নেই, আছে শুধু দুর্নীতি

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে শুধু নেই আর নেই, আছে শুধু দুর্নীতি

গোয়ালন্দ থেকে দরিদ্র ভ্যান চালক হাসেম মৃধা তার চার বছর বয়সী শিশু কন্যা তাছরিনকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। হাসপাতালে আনার পর দালাল চক্র ঘিরে ধরে তাকে। ডাক্তার নেই, ঔষধ নেই এমন কথা বলে পাশের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায় দালাল চক্রের একজন। সদরের হাবাসপুর এলাকা থেকে হাজেরা বেগম পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা নিতে। তাকে অনেকক্ষন বসিয়ে রাখার পর কোন সেবা দেয়া হয়নি। এক মহিলা দালাল হাজেরা বেগমকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে যান অন্যখানে। হাসপাতালে আসা রোগীদের এমনি ভাবে ক্লিনিক গুলোতে নিয়ে যায় দালাল চক্র। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের নিত্য নৈমিত্তিক দৃশ্য এটি। হাসপাতালজুড়ে দালাল চক্রের এমন উপস্থিতি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। রাজবাড়ীর একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভাড়াটে কর্মী এসব দালালের সাথে যোগসূত্র আছে হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর। ১২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে যে জনবল ও যন্ত্রপাতির দরকার তার তেমন কিছুই নেই রাজবাড়ী সদর হাসপাতালটিতে। হাসপাতালজুড়ে কেবলই আর্তনাদ- নেই আর নেই। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা ভেঙ্গে পড়েছে অনেক আগেই। এরপর ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ’ হিসাবে বন্ধ রাখা হয়েছে জরুরী সেবা কার্যক্রম। কোন কারন ছাড়াই ২০০৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘জরুরী বিভাগ’টি বন্ধ করে দেয়। হাসপাতাল কতৃপক্ষ নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছেন ‘জরুরী বিভাগ’। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির মহাসাগরে নিমজ্জিত এ হাসপাতালটি। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র হাসপাতালটিকে জিম্মি করে রেখেছে। ঐ চক্রের কবলে পড়ে রুগ্ন থেকে রুগ্ন অবস্থায় যাচ্ছে হাসপাতালটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোন সেবাই মেলেনা এ হাসপাতাল থেকে। রোগীর স্বজনেরা কোন উচ্য বাচ্য করলেই উন্নত চিকিৎসার অজুহাতে স্থানান্তর করা হয় ফরিদপুরে কিংবা ঢাকায়। ফলে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা মুখ বুঝেই পড়ে থাকেন সেখানে। সবচে বেশী অবহেলার শিকার হন দরিদ্র রোগীরা। সেবাতো মেলেই না, মেলেনা ঔষধও। হাসপাতালের খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও কতৃপক্ষের মাথা ব্যাথা নেই। সিন্ডিকেট চক্রের কারনেই হাসপাতাল কতৃপক্ষের কেউই টু শব্দটি করেন না বলে জানান অনেকেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচটি উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৬৯ সালে ১০০ শর্য্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালটি নির্মান করা হয়।
হাসপাতালটিতে বর্তমানে চিকিৎসক সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। ৪২টি পদের বিপরিতে চিকিৎসক আছেন মাত্র ১৭ জন। খাতা-কলমে ১৭ জন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে ছুটিতে আছেন দুইজন। যারা চিকিৎসা সেবা দেবার জন্য আছেন তারাও ঠিকমতো ডিউটি করেন না। বেলা দুইটা বাজলেই হাসপাতালে চিকিৎসকের দেখা মেলা কষ্ট। বিভিন্ন ক্লিনিক গুলোতেই তারা সময় দেন। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটির কয়েকজন চিকিৎসক রয়েছেন যারা ফরিদপুরের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখেন।
জানা গেছে, হাসপাতালটিতে সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী), সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), সিনিয়র কনসালটেন্ট (অর্থোপেডিক্স), সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি),সিনিয়র কনসালটেন্ট (এ্যানেসথেসিয়া), জুনিয়র কনসালটেন্ট (চক্ষু), জুনিয়র কনসালটেন্ট (এ্যানেসথেসিয়া), জুনিয়র কনসালটেন্ট (রেডিওলজি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু), জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী), জুনিয়র কনসালটেন্ট (প্যাথলজি), মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জনসহ সমমানের নয়জন, একজন প্যাথলজিষ্ট, মেডিকেল অফিসার পদ গুলো শূণ্য রয়েছে। এছাড়া দুই চিকিৎসক নার্গিস সুলতানা ও মাকসুদা আক্তার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি কর্মচারীদেরও পদ শূণ্য রয়েছে। এরমধ্যে নেই সেবা তত্বাবধায়ক, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, দুইজন সহকারী সেবক, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট, প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী, ক্যাশিয়ার, স্টেনোটাইপিষ্ট, কম্পিউটার অপারেটর, ওয়ার্ড মাষ্টার, টিকেট ক্লার্ক, রেকর্ড কিপার, রিসিপশনিষ্ট, লিলেন বিপার, ডোম, জেনারেটর অপারেটর, ডক রুম সহকারী, ওটিবয়সহ একাধিক পদ শূণ্য রয়েছে। হাসপাতালটিতে নেই আর নেই এর মাঝে আছে শুধুই লুটপাট-এমন অভিযোগ স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালটিকে পূঁজি করে শক্তিশালী একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে রোগীদের বরাদ্দকৃত খাবারের টাকা। অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। হাসপাতালের বিনামূল্যের ঔষধ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। দালাল চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লিনিক গুলোতে রোগী হাতিয়ে নেয়াও এই চক্রটির কাজ। নামপ্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, দুর্নীতি আর অনিয়ম বাসা বেঁধে আছে হাসপাতালটিতে। দিনের পর দিন এমনটি চললেও দেখার কেউ নেই। হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন একটি চক্রের কাছে জিম্মি।
চিকিৎসক সংকট আর যন্ত্রপাতি নেই এমন দোহাই দিয়ে হাসপাতাল কতৃপক্ষ রোগী ও তাদের স্বজনদের অন্যত্র যেতে বাধ্য করেন। হাসপাতালের পরিবেশ একেবারেই নোংরাময়। যে কয়টি টয়লেট রয়েছে সেগুলো একপ্রকার অকেজোই বলা চলে। হাসপাতালের শর্য্যা সংখ্যা শতাধিক হলেও মাঝে মধ্যে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে শীতের মধ্যে রোগীদের হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে হয়।
হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. দিপক কুমার বিশ্বাস বলেন, জেলার মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতে যে পরিমান লোকবল দরকার তার অর্ধেকও নেই। এছাড়া জরুরী বিভাগটি ১৫ বছর আগে বন্ধ করে দেয়া হয়। জরুরী বিভাগটি আমরা চালু রেখেছি। আলট্রা ও ডেন্টাল বিভাগের কোন যন্ত্রপাতি নেই। ডিজিটাল এক্সরে মেশিনটি একেবারেই অকেজো। কয়েকমাস আগে ৪ জন ডাক্তারের পোষ্টিং দেয়া হলেও তারা তদবির করে এখানে আসেনি। খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে খাবার সাপ্লাই টেন্ডার বন্ধ রয়েছে। আদালতের নির্দেশের কারনে টেন্ডার করা যাচ্ছে না। বিগত দিনে যারা খাবার সাপ্লাই দিচ্ছেন তারাই সাপ্লাই দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন...

রাজবাড়ীতে নৌকার পক্ষ নেয়ায় ৪ জনকে পিটিয়ে আহত

নির্বাচনে নৌকা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনায় অংশ নেয়ায় রাজবাড়ী জেলা কৃষক লীগের সভাপতি, সম্পাদকসহ চারজনকে বেদম …

দেড় বছর কর্মস্থলে নেই, বেতন নিচ্ছেন নিয়মিত

বোয়ালমারী প্রতিনিধি # দেড় বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট …