৪ অগ্রহায়ন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ রবিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৮
Home » খেলাধুলা » বাংলাদেশের সিরিজ জয়

বাংলাদেশের সিরিজ জয়

অসীম আকাশে কতটুকুন জায়গাজুড়েই বা থাকে চাঁদ! এইটুকুনই তো! কিন্তু সে চাঁদের রুপালি আলোতেই কাল ভেসে যায় অনন্ত অন্তরীক্ষ; সে প্রভায় ডুবে যায় দশ দিগন্ত। প্রবারণা পূর্ণিমার রাতে উৎসবের ফানুস ওড়ে দেশজুড়ে। বাংলাদেশের সামগ্রিকতায় নিত্যদিনের টানাপড়েনে কতটুকুন জায়গাই বা রয়েছে ক্রিকেটের!

এতটুকুনই তো! কিন্তু সে ক্রিকেট-আলোর এতই তীব্রতা, যা ক্ষণিকের জন্য হলেও মুছে দেয় কষ্টের সব অন্ধকার। আনন্দের নাগরদোলায় চড়ে বসে ১৮ কোটি ক্রিকেটপ্রাণ। কাল সাগরিকার স্টেডিয়ামও তাই হয়ে ওঠে যেন উৎসবের বনসাই সংস্করণ। কংক্রিটের এই চত্বর থেকে যা ছড়িয়ে পড়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলে।

জিম্বাবুয়েকে আয়েশে সাত উইকেটে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই যে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিয়েছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল!

প্রত্যাশিত জয়। ভীষণ প্রত্যাশিত। তবু জয় তো! সে জয়ে কত কত আলোকিত পারফরমার! বোলিংয়ে ছয় বোলারের মধ্যে উইকেট পান পাঁচজনই। সফলতম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনের তিন শিকার, তা আলাদা তিন স্পেলে। ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা আঁকা হয় লিটন দাস, ইমরুল কায়েসে। আত্মবিশ্বাসী অপরাজিত দুই ইনিংস মুশফিকুর রহিম, মোহাম্মদ মিঠুনের। সাম্প্রতিক সময়ের ম্যাচগুলোয় এক-দুজনের ব্যক্তিগত ঔজ্জ্বল্যের দিন পেরিয়ে কালকের বাংলাদেশ যেন তাই দলীয় পারফরম্যান্সের এক উজ্জ্বল পোস্টার।

তামিম ইকবালের ওপেনিং সঙ্গী হওয়ার ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’-এ এত দিন কেবল ছুটছিলেন সবাই। চেয়ারে বসে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারছিলেন না কেউ। সর্বশেষ দুই ওয়ানডেতে লিটন ও ইমরুল সেঞ্চুরি করে হাত তোলেন অবশেষে। কাল সম্ভাবনা ছিল দুজনেরই তিন অঙ্কের জাদুকরী সংখ্যা স্পর্শের। কেউ পারেননি তা। লিটন আশির ঘরে আর ইমরুল নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়ে পুড়েছেন সেঞ্চুরি মিসের হাহাকারে। তবে তাঁদের ১৪৮ রানের সেতুতেই তো জিম্বাবুয়ের ছুড়ে দেওয়া ২৪৭ রানের লক্ষ্য হয়ে যায় মামুলি।

প্রথম ওভারে অবশ্য লিটনকে এলবিডাব্লিউ ঘোষণা করেছিলেন আম্পায়ার। কিন্তু রিভিউ নিয়ে সে দফায় রক্ষা। এরপর যথারীতি তাঁর ব্যাটে বাজে বজ্রের বাঁশি। দ্বিতীয় ওভারে চাতারাকে পর পর মারেন দুই বাউন্ডারি; কাইল জার্ভিসের এক ওভারেও দুটি। মাভুতার এক ওভারে দুই বাউন্ডারির একটি আবার উড়ে পেরোয় সীমানা। ওভারে জোড়া বাউন্ডারির ধারা ধরে রেখে শন উইলিয়ামসকে সুইপ ও পুল করে মারা দুই চারে ফিফটিতে পৌঁছে যান লিটন। মাত্র ৪৬ বলে।

ইমরুল শুরুতে খানিক নড়বড়ে। ব্যাটের কানায় লেগে একবার বল পড়ে দ্বিতীয় স্লিপের একটু আগে। আরেকবার উড়ে যাওয়া বল একটুর জন্য পায় না ফিল্ডারের নাগাল। উইকেটে পড়ে থেকে ৫৭ বলে পূর্ণ করেন ফিফটি। সঙ্গী লিটন পঞ্চাশের খানিক পর সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া বল ডিপ মিড উইকেটের ফিল্ডার মুঠোবন্দি করতে পারেন না। এরপর আবারও তাঁর ব্যাটে আত্মবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। কাভার ড্রাইভ কিংবা পুলে ছড়ায় সৌন্দর্যের রং। রাজার করা ওই ২৪তম ওভারেও তো দুর্দান্ত দুই বাউন্ডারি লিটনের। কিন্তু স্লাইস করতে গিয়ে কাভার পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে সেঞ্চুরিটি হারান হেলায়। আউট হয়ে যান ৭৭ বলে ৮৩ রান করে।

ইমরুলের ব্যাটিংয়ে লিটনের রাজসিকতা থাকে কদাচিৎ। কিন্তু কার্যকারিতায় অনবদ্য। এর আরেক প্রস্ত প্রমাণ কাল। যদিও শুরুটা ভালো হয়নি; যদিও ফিফটির পরও দেন আউটের সুযোগ। কিন্তু ৫৮ রানের সময় ইমরুলের ব্যাট ছুঁয়ে যাওয়া ক্যাচ জমে না কিপারের গ্লাভসে। খানিক পর উড়ে যাওয়া বল একটুর জন্য পায় না ফিল্ডারের মুঠোর আশ্রয়। এই করতে করতে নব্বইয়ে পৌঁছে যাওয়ায় সেঞ্চুরিটি অবধারিতই মনে হচ্ছিল। কিন্তু লং অফ ফিল্ডারকে ক্যাচ দিয়ে ১১১ বলে ৯০ রান করে আউট তিনিও।

ওপেনারদের রাজত্বে তিন নম্বরে নেমে আবারও ব্যর্থ ফজলে মাহমুদ। আগের ম্যাচে আন্তর্জাতিক অভিষেকে রানের খাতা খোলার আগে আউট চতুর্থ বলে। কাল এক বল বেশি টেকেন, তবে রানের খাতা ওই শূন্যই। আরো হতাশার, এবার আর ভালো বলের শিকার নন। বরং রাজার স্পিনে বেরিয়ে মারতে গিয়ে হয়ে যান স্টাম্পড। কে জানে, দুই শূন্যেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল কি না ফজলের! তিনি আউট হলেও জয়ের ঠিকানায় পৌঁছাতে সমস্যা হয়নি বাংলাদেশের। মুশফিকুর রহিম (৪০*) ও মোহাম্মদ মিঠুনের (২৪*) ব্যাটে বাকি পথটুকুন পাড়ি দেয় নিরাপদে। ৪৪.১ ওভারে মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ম্যাচ ও সিরিজ জয় নিশ্চিত করে মাশরাফির দল।

ব্যাটিংয়ে যেমন সম্মিলিত পারফরম্যান্স, বোলিংয়েও তা-ই। সে কারণেই নির্ধারিত ৫০ ওভারে সাত উইকেটে ২৪৬ রানের বেশি করতে পারে না জিম্বাবুয়ে। তিন উইকেট নিয়ে সফলতম সাইফুদ্দিন ম্যাচ শেষে বিবেচিত ম্যাচসেরা হিসেবে। হাত ঘুরিয়ে উইকেট পান মাশরাফি-মুস্তাফিজ-মেহেদী-মাহমুদ উল্লাহ—সবাই। নাজমুল ইসলামই শুধু ১০ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে যোগ দিতে পারেন না সে উল্লাস মিছিলে। তবু আড়াইর মধ্যে জিম্বাবুয়েকে আটকে রাখার কৃতিত্বের অংশ তো এই বাঁহাতি স্পিনারও। তৃপ্তি বাড়ার কথা শেষ দিকের বোলার-ফিল্ডারদের পারফরম্যান্সে। ৩৭ ওভার শেষে জিম্বাবুয়ের রান যখন ছিল তিন উইকেটে ১৮৫। তিনে নামা ব্রেন্ডন টেলরের ৭৫ রানে বড় স্কোরের পথেই ছিল সফরকারীরা। তাঁকে এলবিডাব্লিউ করে ব্রেক থ্রু মাহমুদ উল্লাহর। আর ৩৮তম ওভারে সেট ব্যাটসম্যান শন উইলিয়ামসকে (৪৭) মিডিয়াম পেসার সাইফুদ্দিন আউট করার পর তো পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। সাত উইকেট হাতে নিয়েও শেষ ১৩ ওভারে ৬১ রানের বেশি করতে পারে না জিম্বাবুয়ে। ছয় উইকেট হাতে নিয়েও শেষ পাঁচ ওভারে করতে পারে না ১৯ রানের বেশি।

বাংলাদেশের সামনে তাই থাকে ২৪৭ রানের লক্ষ্য। যা রানপাহাড় নয় কিছুতেই, বড়জোর রানটিলা। তা জয় করতে মোটেই সমস্যা হয়নি স্বাগতিকদের। প্রবারণা পূর্ণিমার আলো ও ফানুসে বাংলাদেশের ক্রিকেট কাল তাই পায় আরেক উৎসবের উপলক্ষ। সে পার্বণ জিম্বাবুয়েকে ওয়ানডে সিরিজে হারানোর।

হলোই বা প্রত্যাশিত! তবু উৎসব-তিথিতে উৎসবে ভেসে যেতে বাধা কী!

আরও পড়ুন...

১৫ মিনিটেই হ্যাটট্রিক কলিন্দ্রেসের

স্পোর্টস ডেক্স # বিশ্বকাপ তারকাদের গোল করার ক্ষমতা তো এমনই হয়। বল পায়ে দুর্দান্ত গতিতে …

১৭ বছর পর জিম্বাবুয়েকে এই স্বাদ দিল বাংলাদেশ

ব্রেন্ডন মাভুতার বয়স তখন মাত্র মাত্র ৪ বছর। জিম্বাবুয়ে দলের হয়ে আসা এই স্পিনারের মনে …